বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই ২০২৬ - ১১:৩৬
বাহরাইনের বিচারব্যবস্থা ও দেশটির শিয়া সম্প্রদায়কে ধর্মীয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ

বাহরাইনের ক্ষমতাসীন সরকার শিয়া আলেম ও ধর্মীয় নেতাদের গ্রেপ্তারকে যতই ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ ইত্যাদি অভিযোগের আড়ালে উপস্থাপন করুক না কেন, এই গ্রেপ্তারগুলো দেশটির অন্যতম বড় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবেই থেকে যাবে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, বাহরাইনের শাসকগোষ্ঠী শিয়া আলেম ও ধর্মীয় নেতাদের গ্রেপ্তারকে তাঁদের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’সহ বিভিন্ন অভিযোগে আচ্ছাদিত করার চেষ্টা করলেও, এসব গ্রেপ্তার দেশটির অন্যতম গুরুতর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

যদিও কারাগারে থাকা বিশিষ্ট আলেমদের সংখ্যা ৪০ জনেরও বেশি, তবুও সরকার এই আলেমদের মধ্যে ১৯ জনের বিচার গোপনে এবং কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

যেসব আলেম এই বিচারের আওতায় রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন: সাইয়্যিদ মাজিদ আল-মাশআল, শাইখ আলী আল-সাদ্দাদি, শাইখ মুহাম্মদ সানকুর, শাইখ ফাদিল আল-জাকি, শাইখ মুহাম্মদ আল-খারসি, শাইখ ঈসা আল-মুমিন, সাইয়্যিদ মূসা আল-ওয়াদাঈ, শাইখ মুহাম্মদ জাওয়াদ আল-শাহাবি, শাইখ মির্জা আল-মা'তুক, শাইখ হামিদ আশুর, শাইখ আইয়ুব আল-বাহরানি এবং বিদেশে অবস্থানরত আরও ৮ জন আলেম।

বাহরাইনের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলায় একাধিক গুরুতর অনিয়ম রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • বিচার গোপনে পরিচালিত হচ্ছে।
  • অভিযুক্তদের নিজেদের আইনজীবী বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
  • প্রতিরক্ষা পক্ষকে মামলার নথি ও সরকারি দলিলপত্র দেখতে দেওয়া হয়নি।
  • আইনজীবীদের সতর্ক করা হয়েছে যে, তাঁরা যদি মক্কেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ বা মামলার নথির অনুলিপি চান, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
  • গ্রেপ্তারের পর থেকে আইনজীবীরা একবারও তাঁদের মক্কেলদের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি।
  • অভিযুক্তদের সরাসরি বিচারকের সামনে হাজির করা হয়নি; ভিডিও কলের মাধ্যমে তাঁদের বিচার চলছে।
  • পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় অভিযুক্তদের ওপর কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে এবং মামলার বিষয়ে কিছু বলতে শুরু করলেই ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে।
  • সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিজেদের পছন্দের আইনজীবী নিয়োগ করে দিয়েছে এবং অভিযুক্তরা তাঁদের প্রত্যাখ্যান করলেও মামলা থেকে সরে না দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে।

এ ছাড়া, মানবাধিকারকর্মীদের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, আটক কয়েকজন আলেম তাঁদের পরিবারের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কথোপকথনে জানাতে সক্ষম হয়েছেন যে, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগপত্রে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে এর একটিই ব্যাখ্যা হতে পারে-এটি একটি ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং এমনকি সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার, যেখানে কোনো ধরনের গোপনীয়তা বা দ্ব্যর্থতার অবকাশ নেই। তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো কেবল শিয়া ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং কোনো স্বীকৃত ফৌজদারি অপরাধের ভিত্তিতে নয়।

আরও দাবি করা হয়েছে যে, এ বিষয়ে আর নমনীয়তার সুযোগ নেই। কারণ এ পর্যন্ত সরকারের আনুষ্ঠানিক আচরণ প্রমাণ করে যে, এই বিচার সম্পূর্ণ অন্যায্য এবং একটি পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে আইনি বৈধতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালিত প্রদর্শনমূলক বিচার।

শিয়া ধর্মীয় নেতাদের-বিশেষ করে আয়াতুল্লাহ ঈসা কাসেমকে-লক্ষ্যবস্তু করা সরকারের নীতিতে পরিণত হয়েছে এবং বিচারব্যবস্থাকে সেই নীতির বৈধতা প্রদানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

উপসংহারে বলা হয়েছে, আজ এটি শুধু ১১ জন আলেম বা কারাগারে থাকা ৪০ জনেরও বেশি ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের মামলা নয়; বরং এটি বাহরাইনে আইনের শাসনের একটি পরীক্ষা।

যখন ন্যায্য বিচারের মৌলিক নিশ্চয়তাগুলো অস্বীকার করা হয়, প্রতিরক্ষাকে তার ভূমিকা পালনে বাধা দেওয়া হয় এবং বিচারপ্রক্রিয়া জনসাধারণের দৃষ্টির আড়ালে রাখা হয়, তখন সেটিকে আর স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়া বলা যায় না; বরং এটি মামলাটির পরিচালনা এবং এর আইনগত, সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে গভীর আস্থাসংকটের ইঙ্গিত দেয়।

শেষে বলা হয়েছে, যেকোনো বিচার যদি মৌলিক আইনি নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত হয়, তবে তা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক-উভয় পর্যায়েই প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে এবং এ ধারণা আরও জোরদার করবে যে সংকটটি কেবল অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নয়; বরং রাষ্ট্র ও তার নাগরিকদের একটি বৃহৎ অংশের মধ্যকার সম্পর্কের সঙ্গেও জড়িত।

ন্যায়বিচার কেবল রায়ের মাধ্যমে নয়, বরং সেই রায়ে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার মাধ্যমেই মূল্যায়িত হয়।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha